সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার কুনকীরি ফারুক আহমেদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক মামুন উর রশীদের অবসরজনিত বিদায় উপলক্ষে আবেগঘন পরিবেশে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষা বিস্তার, শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষায় গড়ে তোলা এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় বিদায় জানান।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর ২০২৬) দুপুর ২টায় বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এ বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শিক্ষক, প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রিয় শিক্ষকের দীর্ঘদিনের কর্মময় জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী। সংবর্ধিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক মামুন উর রশীদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপি নেতা এম এ হক, ১নং রুস্তমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন শিহাব, গোয়াইনঘাট মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও তোয়াকুল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্বাস উদ্দিনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কুনকীরি ফারুক আহমেদ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোবারক হোসেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক শফিকুর রহমান এবং নুরুল আমিন।
অনুষ্ঠানে অতিথিদের বক্তব্যে এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে প্রধান শিক্ষক মামুন উর রশীদের দীর্ঘ কর্মজীবনের নানা দিক। বক্তারা বলেন, একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না; তিনি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও শৃঙ্খলার শিক্ষা দিয়ে ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মামুন উর রশীদ তাঁর শিক্ষকতা জীবনে সেই দায়িত্ব নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেছেন।
তাঁর হাত ধরে অসংখ্য শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পেয়েছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রায় তাঁর ভূমিকা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।
প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাঁদের বক্তব্যে প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন। তাঁরা বলেন, একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে মামুন উর রশীদ শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু শিক্ষকই ছিলেন না, ছিলেন অভিভাবক, পথপ্রদর্শক ও অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা ও মূল্যবোধ ভবিষ্যতেও তাঁদের পথ চলার প্রেরণা জোগাবে।
বক্তারা তাঁর অবসরজীবনের সুস্বাস্থ্য, সুখ, শান্তি ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের স্মৃতিচারণে আবেগাপ্লুত বিদায়ী প্রধান শিক্ষ মামুন উর রশীদ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করেন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেওয়া এবং এমপিওভুক্ত করার প্রচেষ্টাসহ দীর্ঘ কর্মজীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তিনি উপস্থিত সবার সামনে তুলে ধরেন।
তিনি বিদ্যালয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা, শিক্ষকতা জীবনের নানা স্মৃতি এবং শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা আন্তরিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। তাঁর বক্তব্যে বিদ্যালয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের প্রতিফলন ঘটে।
বিদায়ী বক্তব্যে তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং এলাকাবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের উত্তরোত্তর উন্নতি ও শিক্ষার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
জীবনের আগামী দিনগুলো যেন সুন্দর, সুস্থ ও নিরাপদভাবে কাটাতে পারেন, সে জন্য তিনি সবার কাছে দোয়া কামনা করেন। তাঁর আবেগঘন বক্তব্যে উপস্থিত অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে আবেগের সৃষ্টি হয়।
বিদায় সংবর্ধনা উপলক্ষে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রিয় শিক্ষককে বিভিন্ন উপহারসামগ্রী প্রদান করেন। ফুলেল শুভেচ্ছা ও উপহারের মধ্য দিয়ে তাঁরা প্রিয় শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ফুলের তোড়া দিয়ে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। পরে ফুল ছিটিয়ে ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে বিদায় দেওয়া হয় তাঁদের প্রিয় শিক্ষককে। দীর্ঘদিনের পরিচিত বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তটি উপস্থিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল অত্যন্ত আবেগঘন।
বিদায়ী শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দিতে শিক্ষার্থীরা মোটরসাইকেল ও গাড়িবহরের মাধ্যমে শোভাযাত্রার আয়োজন করেন। প্রিয় শিক্ষকের প্রতি তাঁদের এই সম্মান ও ভালোবাসা অনুষ্ঠানে এক বিশেষ আবহ তৈরি করে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক যে কেবল শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা শ্রদ্ধা, স্নেহ ও কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ—এ আয়োজন যেন তারই প্রতিফলন।
একজন শিক্ষকের অবসর মানে তাঁর দায়িত্বশীল কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলেও শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে তাঁর অবদান কখনো মুছে যায় না। শিক্ষা, আদর্শ ও মূল্যবোধের মাধ্যমে একজন শিক্ষক প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করেন। কুনকীরি ফারুক আহমেদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মামুন উর রশীদের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও সেই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের আন্তরিক অংশগ্রহণে আয়োজিত এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি প্রিয় শিক্ষকের কর্মময় জীবনের প্রতি সম্মান জানানোর পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গভীর সম্পর্কের এক স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।